পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পণ্য ও সেবা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় করা কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বাজারটি। খবর ইকোনমিক টাইমস।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (এলএসইজি) প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর সবুজ অর্থনীতিভিত্তিক কোম্পানিগুলোর আয় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার উদ্যোগ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক থাকলেও সবুজ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থেমে নেই। বরং খাতটিতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।
এলএসইজির সংজ্ঞা অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠানের মোট আয়ের অন্তত ২০ শতাংশ পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম থেকে আসে, সেগুলোকে সবুজ অর্থনীতির অংশ হিসেবে ধরা হয়। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি ও পরিবেশগত বিভিন্ন সমাধানভিত্তিক ব্যবসা অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিবেদনে বিশ্বের ২১ হাজার কোম্পানির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এসব কোম্পানির সবুজ আয়কে একটি পৃথক শিল্প খাত হিসেবে বিবেচনা করা হলে এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প খাতে পরিণত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারমূল্য কোনো কোম্পানির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও প্রত্যাশিত মুনাফার প্রতিফলন ঘটায়।
কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ গারনট ওয়াগনার বলেন, ‘১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যের অর্থ হলো বিপুল পরিমাণ মূলধন নবায়নযোগ্য, সবুজ ও লো-কার্বন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এসব খাত থেকে দীর্ঘমেয়াদে লাভের আশা করছেন।’
তার মতে, এটি শুধু পরিবেশগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়। এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বার্তাও বহন করে। কারণ বিনিয়োগকারীরা এমন খাতে অর্থ ঢালছেন, যেখান থেকে তারা ভবিষ্যতে স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন।
এলএসইজির গ্রিন ইকোনমি ও রেগুলেটরি সলিউশনস বিভাগের প্রধান লিলি দাই বলেন, ‘সবুজ অর্থনীতির আয়ের প্রবৃদ্ধি কয়েক বছর ধরেই স্থিতিশীল ছিল। তবে ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধির গতি আরো বেড়েছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট ও নীতিগত অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও সবুজ অর্থনীতি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখছে।
গার্নট ওয়াগনার মনে করেন, জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নিয়ে গেছে। ফলে সবুজ অর্থনীতির গুরুত্ব আরো বেড়েছে।
এলএসইজির প্রতিবেদনটি মূলত বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, সবুজ অর্থনীতির কোম্পানিগুলোর মধ্যে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) কার্যক্রমও বাড়ছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি সাধারণত প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি খাত। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানি নেটএরা এনার্জি সম্প্রতি ডোমিনিয়ন এনার্জির সম্পদ অধিগ্রহণ করেছে। এলএসইজির মতে, এ ধরনের চুক্তি ভবিষ্যতে বড় আকারের সবুজ জ্বালানি ব্যবসা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
তবে প্রতিবেদনে সবুজ অর্থনীতির জটিলতাও তুলে ধরা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করলেও একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, শুধু বিনিয়োগকারীরাই নয়, বিভিন্ন সরকারও সবুজ অর্থনীতির প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা উপলব্ধি করছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করাও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি সরকারের আগ্রহ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনে জোর দেয়া হলেও দেশটি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় সবুজ অর্থনীতির বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড ৭৯ দশমিক ৭ গিগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু প্রকল্প বাতিল হলেও এ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, করপোরেট খাতের চাহিদাই এ প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি। বিশেষ করে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
২০২৫ সালে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ক্রয়চুক্তির প্রায় অর্ধেক এসেছে চারটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। এগুলো হলো মেটা, অ্যামাজন, গুগল ও মাইক্রোসফট।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে কিছু কোম্পানি নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা পুনর্বিবেচনা করছে।
এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সবুজ অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। বিদ্যুতায়ন বৃদ্ধি ও ডেটা সেন্টারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এ খাতের প্রবৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবুজ অর্থনীতির ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি বৈশ্বিক বিনিয়োগের নতুন প্রবণতারও প্রতিফলন। দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও লো-কার্বন ব্যবসার চাহিদা আরো বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ফলে খাতটি আগামী বছরগুলোয়ও বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির উৎস হয়ে থাকতে পারে।